ভাবির চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে।ভাবি আমার হাতে অনেক
গুলো টাকা দিয়ে বলে টাকার দরকার পড়লে যেন ভাবিকে
জানাই।।।ভাবি চোখ মুছে আমার রুম থেকে বের হয়। কিন্তু আমার
চোখের পানি জোরায় না।রুমটার প্রতি মায়া লাগছিল।।আম্মুর পায়ে
একবার সালাম করতে মন চাচ্ছিল কিন্তু সেই সাহস আজ আমার নেই।
সবাই আমার চলে যাওয়া দেখছে।ভাবি সবার চোখের আরালে বার
বার চোখ মুছছে?
১২টার বাসে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে,,,
কিন্তু কোথায় গিয়ে উঠবো,,ঢাকা গিয়ে কি করবো?খুব চিন্তা
হচ্ছিল।কারন ঢাকা আমি ভালো করে চিনি না।আর কোনো
আত্মীয় স্বজন নাই যে সেখানে গিয়ে উঠবো। ভাবির দেওয়া
টাকা গুলো গুনলাম ৫০০০ টাকা আছে এখানে।আর আমার পকেটে
৭৮০টাকা।ভাবি যদি টাকা না দিতো তাহলে ত ২ দিন বেচে থাকা কষ্টকর
হয়ে যেত।।এমনে কোনো কাজও জানি না।
সবে মাত্র কলেজে পা দিয়েছি।আব্বুর টাকার অভাব নাই।যার জন্য
লেখাপড়াটাই করেছি মন দিয়ে। পরিবারের সবাই আমাকে অনেক
ভালোবাসতো।আমার কোনো দুষ ছিল না।শুধু একটাই দুষ আমি
মিথিলাকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম।। যখন থেকে বুজতে
শিখেছি তখন থেকেই মিথিলাকে ভালোবাসতাম আমি।একসাথে
স্কুলে যাওয়া খেলাধুলা করা।আমরা ছিলাম বেস্ট ফ্রেন্ডের
মতই।কিন্তু যখন মিথিলাকে স্কুলের এক বড়ভাই ফলো করতে
শুরু করে।আর মিথিলা যদি সম্পর্কের জড়িয়ে যায় সেই ভয়ে সুমি
আপুর বিয়ের দিনই প্রপোজ করি মিথিলাকে।
কিন্তু মিথিলা সাথে সাথে এই কথা আমার আব্বুকে এসে বলে
দেয়। আব্বু আমাকে সেদিন অনেক মারে।।
তখন নবম শ্রেনীতে উঠেছি মাত্র।।আমার আর বিয়ে খাওয়া
হলো না।।আব্বুর হাতের মাইর সেদিন প্রথম খেয়েছিলাম।আব্বু
বলেছিল মিথিলাকে যেন নিজের বোনের মতই দেখি।।আমার
মাইর দেখে মিথিলা অনেক হেসেছিল। কিন্তু মিথিলার প্রতি রাগ
আসে নি আমার।,,
বিয়ের দিন সুমি আপুর সাথে যাওয়ার জন্য বলেছিল আপু।আমিও
প্রিপেরেশন নিয়ে রেখেছিলাম।কিন্তু আমার আর যাওয়া হলো
না।।মিথিলাই গেলো।আব্বক আমাকে মাইরের কারন টা শুধু ভাবিই
জানতো।আর সবাই জেনেছে দুস্টুমির জন্য মেরেছে।
অনেকে আব্বুকে রাগ দেখিয়ে বলেছিল। দুষ্টুমির জন্য
কেউ এমনে মারে।আর বিয়ের দিন ফাইজলামি করবে না তো
কবে করবে?
আপুকে আনার জন্য গিয়েছিলাম,,।আপু না যাওয়ার কারন কি জানতে
চেয়েছিল কিন্তু কিছু বলি নাই।।।তবে মিথিলার মনে যেন
আনন্দের জোয়ার বইছে।নতুন দুলাভাইয়ের সাথে ভালোই
খাতিল জমেছে।।আমার খুব ভালো লাগলো বড় ভাইয়ের অভাবটা
দুলাভাইকে দিয়েই পুরন করুক।
আপুকে নিয়ে বাসায় আসলাম,,,দুলাভাইয়ের সাথে আমারও ভালো
সম্পর্ক গড়ে উঠে।।খুব ভালোভাবেই যাচ্ছিল দিনগুলো।
কিন্তু বার বার মিথিলাকে আমার মনের কথা বলার চেস্টা করেছি।মিথিলা
বলতো আমি তোকে শুধুই ভাইয়ের মত দেখি।।।দুলাভাইক
ে দিয়েও বলেছিলাম অনেক বার কাজ হয় নি।।
তবে দুলাভাই আর মিথিলাকে অনেক বার একান্তে দেখেছি।
মনে হচ্ছিল প্রেমিক প্রেমিকা বসে প্রেম করছে।। কিন্তু
আমি তখন এইসব নিয়ে ভাবি নাই।।কারন মিথিলা,,দুলাভাই এমন না।।
পরবর্তিতে এমনই হলো।।
হঠাৎ মোবাইলে মেসেজ টিউন বেজে উঠে,,,কল্পনা
থেকে বাস্তবে ফিরে আসি।।মিথিলার নাম্বার থেকে
মেসেজ।।কি লিখেছে?
-- আমার রুপ বের করতে গিয়ে নিজেই ধরা খেলি কেমন অভিনয়
টা করলাম?(মিথিলার লেখাটা পরে চোখের কোনে জমে থাকা
কষ্ট গুলো বের হতে চাচ্ছিল)
-- আমি জানি না তুই এমনটা কেন করেছিস।।তবে আমি চাইলে আমি
তোদের রুপটা বের করে দিতে পারতাম।কিন্তু তোর সম্মান
আর আপুর সংসারের কথা ভেবে কাউকে কিছু বলি নাই(আমি)
-- তাই নাকি,,,তর কাছে কি প্রমান আছে নিজেকে সাধু বানানোর
জন্য?তবে কেন তোকে বাসা থেকে বের করেছি জানিস।
যেন আমাদের সম্পর্ক আর কেউ না জানে।আর তোর কাছে
যেন ছোট হয়ে না থাকতে হয়।(মিথিলা)
-- ভালো করেছিস,,,এতে আমার কোনো দুঃখ নাই।শুধু বলবো
আপুর সংসারটা নষ্ট করিস না প্লিজ।।তোদের এই অবৈধ সম্পর্ক
নষ্ট করে।সবাই যেমন ভাবতো তোকে সেইরকম ভাবে
চল।।
-- তুই আমাকে বলবি আমি কি করবো?আমি দুলাভাইকে বিয়ে
করবো?(মিথিলা)
তার পর আমি রিপ্লে দিলাম,,,কিন্তু মেসেজ সেন্ড হচ্ছে না।।।
বুজতে বাকি নেই এই সিম টা নষ্ট করে ফেলেছে।।
কিন্তু আমার মনে খুব ভয় জন্মাচ্ছিল,,,আপুর সংসায় টা কি মিথিলা ধংশ
করে দিবে।
তাই আমি সাথে সাথে দুলাভাইকে,,,ভিডিওটা পাঠিয়ে ছোট করে
লিখে দিলাম।।
-- আমি চাইলে এই ভিডিওটা সবাইকে দেখাতে পারতাম।এতে করে
আপনাদের সম্মান কোথায় যেত একবার ভেবে দেখেন।
কিন্তু আমি তা করি নি।আমি না হয় এই অপবাদে ভালোভাবেই বেচে
থাকতে পারবো। কিন্তু মিথিলা?মিথিলার আব্বু নাই,,আমার আব্বু
নিজের মেয়ের মতো আদর করে।সেই আদর টা থাকতো না।
আর মিথিলার সম্মান টা কোথায় থাকতো।
আর আপনার?আপুর চোখে সারাজিবন ধর্ষক হয়ে বেচে
থাকতেন।হতে পারতো আপনাদের সংসার টা ভেংগে গেছে।
আর আমাদের বাড়িতে যেই সম্মানে আছেই সেই সম্মানটা ঘৃনায়
পরিনত হতো।।।।
-- তাই আপনাদের একটা সুযোগ দিলাম,,,আপনাদের এই অবৈধ
সম্পর্ক থেকে সরে আসুন।।সম্মান আর আপুর ভালোবাসা নিয়ে
বেচে থাকুন।মনে রাখবেন আপনার একটা ফুটফুটে বাচ্চাও
আছে।(আমি মেসেজ টা দিয়ে বসে রইলাম)
বাস একটা স্টেশনে এসে থামলো।।বাস থেকে নেমে
পেটে খুব ক্ষুধা লাগছিল। তাই হোটেলে গিয়ে খাবার খেয়ে
নেই।। রাস্তার পাশ ধরে হাটছি।।কিন্তু এখন আমি কোথায় যাবো?কি
করবো ভেবে পাচ্ছি না। আব্বু আম্মুর কথা গুলো কানে
বাজছিল।।(তুই আমার ছেলে না।।তোকে কোন পাপে পেটে
ধরেছি।)মাগো তুমিও তোমার ছেলেকে চিনলে না।।চোখ
থেকে অনবরত পানি ঝরছিল।।,, অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা দিয়ে
হাটতেছি।।দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
হঠাৎ ই রাস্তার মাঝখানে একটা বাচ্চাকে দেখলাম।যেকোনো
মুহুর্তে গাড়িতে চাপা পরতে পারে।।আমি কোনো কিছু না
ভেবে ব্যস্ত রাস্তায় নেমে গিয়ে আব্বাটাকে কোলে
করে রাস্তার পাশে নিয়ে যাই।।কিন্তু শেষের দিয়ে একটা গাড়ি
এসে আমার পায়ের উপড় দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়।।আমি ব্যথায়
কাতরাচ্ছি,,,, বাচ্চাটির,,,মা এসে আমাকে হাসপাতাল নিয়ে গেলো।
আর একদিক দিয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে অন্যদিক দিয়ে
নিজের বেখেয়ালির জন্য বাচ্চাকে বাচাতে গিয়ে আমার এমন
অবস্থার জন্য নিজেকে দুষারুপ করছে।
ডাক্তার এসে আমাকে কি যেন একটা ইঞ্জেকশন দিলো।
আস্তে আস্তে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসলো।।
চোখ খুলে দেখি পায়ে ভেন্টিস,,,বাচ্চাটি ও বাচ্চাটির মা
আরেকটা আমাদেরই সমবয়সী মেয়ে পাশে দাড়িয়ে আছে।
ডাক্তার এসে বললেন,,,
-- পা টা খুব ভালোভাবেই ভেংগেছে,,,,আমি উষুধ লিখে দিচ্ছি
নিয়মিত খাওয়াবেন।।আর রোগীকে ১ মাস রেস্ট নিতে হবে।
খেলাধুলা কোনো কাজ করতে পারবে না।১৫ দিন পর আবার
দেখিয়ে যাবেন?(ডাক্তার প্রেস্কিপশন ধরিয়ে দিলেন।)
-- আমার জন্য আজ তোমার এত বড় ক্ষতি হলো,,,?(বাচ্চার মা)
-- না না আন্টি নিজেকে দুষারুপ করবেন না। এটা শুধু একটা
এক্সিডেন্ট।। (আমি)
-- আচ্ছা তোমার বাসা কোথায়? তোমার ফেমিলির কারো নাম্বার
থাকলে দেও,,।আমি তোমার মা,,বাবাকে আসতে বলি?(আন্টি)
-- আমার মোবাইলটা? (মোবাইলটা খুজে পাচ্ছিলাম না)
-- তোমার মোবাইল রাস্তায় পরে ভেংগে গেছে,,,?
(মোবাইল্টা আমার হাতে দিয়ে।।)
এটা ত একেবারে গেছে,,,মোবাইলটা হাতে রেখে,,,
পকেট থেকে ভাবির দেওয়া টাকাটা বের করে..
-- আন্টি হাসপাতালে কত টালা বিল এসেছে জানি না।আমার কাছে এই
কয়েকটা টাকা আছে।গ্রাম থেকে আসার সময় নিয়ে এসেছিলাম।
এটা রাখেন প্লিজ(টাকাটা বাড়িয়ে)
-- কি করছো তুমি এইসব?আমার ছেলেকে বাচাতে গিয়ে
তোমার এই অবস্থা আর তুমি আমাকে চিকিৎসার খরচ দিচ্ছ।।(আন্টি
টাকাটা পকেটে ডুকিয়ে দিয়ে)
-- তোমার,,পরিবারে কেউ নেই,,তাদের ত খবর দিতে হবে?
(আন্টি)
-- আছে,,আব্বু, আম্মু,ভাই,ভাবি,চাচি,চাচাতো বোন,,।কিন্তু এখন
আমি ওদের কেউ না। (বলতেই চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে
আসলো)
-- তাহলে আপনি যাবেন কোথায়?(মেয়েটি)
-- জানি না,,আজ সকালেই বাসা থেকে বের করে দিয়েছে
আমাকে।একটা মিথ্যা পাপের অপরাধে।।(আমি কান্না করছিলাম)
-- আচ্ছা তাহলে তুমি আমাদের বাসায় আসো?তোমার এখন
রেস্টের দরকার।(আন্টি)
-- না আন্টি এটা কি করে হয়,,,উপকার করেছি বলে আপনাদের
বাসায় গিয়ে উঠবো। আপনাদের বাড়তি ঝামেলা হবে?(আমি
চোখ মুছে বললাম)
-- চুপ করেন?এত ভালো মানুষ সাজার দরকার নাই।আমার ভাইকে
বাচিয়েছেন।এখন আপনাকে বাচানোর দায়ীত্ব আমাদের চলুন?
(মেয়েটি)
-- হুম চলো উঠো,,,(আন্টি আমার এক হাত ধরে তুললেন)
-- আন্টি আমার ব্যাগটা কই?(আমার কাপড়ের ব্যাগ)
-- আমরা ত তোমার ব্যাগ দেখি নাই।মনে হয় কেউ নিয়ে
গেছে।(আন্টি)
আন্টি এক হাতে,,আর মেয়েটি আমার আরেক হাতে ধরে হাটার
জন্য বললো।কিন্তু আমি পা ফেলতে পারছি না।।খুব কষ্ট হচ্ছে।।
প্রথম পা ফেলেই চিৎকার দিয়ে উঠলাম।।
-- আস্তে আস্তে পা ফেলো,,,,(আন্টি)
চলবে,,,



No comments:
Post a Comment